ইংরেজি, গণিত ও বিজ্ঞান-এই তিন বিষয়ের কারণে অনেক পরীক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়। পাসের হার কম হওয়ার পেছনেও থাকে তিনটি বিষয়ের খারাপ ফল। কিন্তু এবারের জেএসসি ও জেডিসি পরীক্ষায় এই তিন 'কঠিন' বিষয়ের 'ভীতি' কাটিয়ে উঠেছে কিশোর শিক্ষার্থীরা। সরকারের নির্দেশনা, শিক্ষকদের প্রচেষ্টা ও শিক্ষার্থীদের পরিশ্রমের ফলেই এটা সম্ভব হয়েছে। এতে জেএসসি ও জেডিসির দ্বিতীয় আসরে এসেই গড় ফলাফলে 'বাজিমাত' করেছে কিশোররা। এ ছাড়া পরীক্ষা ও প্রশ্নপত্র নিয়ে যে আতঙ্ক ছিল, পরীক্ষা শুরু হওয়ার দ্বিতীয় আসরে এসেই তাও কেটে গেছে বলে ফলাফল বিশ্লেষণে মনে হয়েছে।
এক বছর আগে অষ্টম শ্রেণী শেষে সমাপনী পরীক্ষা (জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট-জেএসসি ও জুনিয়র দাখিল সার্টিফিকেট-জেডিসি) চালু হয়। ২০১০ সালে জেএসসিতে জিপিএ ৫ পেয়েছিল সারা দেশে মাত্র আট হাজার ৫২ জন। এ বছর পেয়েছে ২৯ হাজার ৮৩৮ জন_যা গত বছরের চেয়ে ২১ হাজার ৭৮৬ জন বেশি। জেডিসিতে গত বছর জিপিএ ৫ পেয়েছিল ৫০৪ জন এবং এ বছর জিপিএ ৫ পেয়েছে এক হাজার ১৪ জন_যা গত বছরের চেয়ে ৫১০ জন বেশি।
এবার সারা দেশে পাসের হার জেএসসি ও জেডিসি মিলে ১০.৬৭ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ৮৩.১ শতাংশ। এর মধ্যে আলাদাভাবে চলতি বছর জেএসসিতে পাসের হার ৮২.৬৭ শতাংশ_যা গত বছরের চেয়ে ১১.৩৩ শতাংশ বেশি। জেডিসিতে চলতি বছর পাসের হার ৮৮.৭১ শতাংশ_যা গত বছরের চেয়ে ৭.৬৮ শতাংশ বেশি। শুধু তাই নয়, গতবারের চেয়ে ফেল করার হারও এবার অনেক কমেছে।
গত বছর থেকে এ বছর মাদ্রাসা বোর্ডে জিপিএ ৫ বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। আর সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে জিপি ৫ বেড়েছে গত বছরের চেয়ে ২১ হাজার ৭৮৬। মাদ্রাসা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মো. নজমুল হুদা কালের কণ্ঠকে বলেন, পরীক্ষায় শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের হার বেড়েছে। এ জন্য পাসের হার ও জিপিএ ৫ প্রাপ্তির হার বেড়েছে। এ ছাড়া জিপিএ ৫ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের মধ্যে পড়শোনার আগ্রহ বেড়েছে বলেও তিনি মনে করেন।
সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে জিপিএ ৫ বেড়ে যাওয়ার কারণ সম্পর্কে যশোর শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আমিরুল আলম খান কালের কণ্ঠকে বলেন, সবাই নিজ নিজ অবস্থান থেকে নিরন্তর কাজ করার কারণে পাসের হার এবং জিপিএ ৫ প্রাপ্তির হার বেড়েছে।
ফলাফলের তাৎক্ষণিক বিশ্লেষণ করে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ কালের কণ্ঠকে বলেছেন, গত বছরের তুলনায় এবার শিক্ষা সূচকের ক্ষেত্রেই ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে। একই সঙ্গে আগের চেয়ে শিক্ষার মান বেড়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। শিক্ষামন্ত্রী বলেন, শিক্ষার উন্নয়নে সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার কারণেই শিক্ষা ক্ষেত্রে আজ এ অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে। ফলাফল 'সন্তোষজনক' উল্লেখ করে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, গতবারের তুলনায় এবার শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে, পাসের হার বেড়েছে, জিপিএ ৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে। অন্যদিকে অনুত্তীর্ণ শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে এবং একজন শিক্ষার্থীও পাস করেনি_এমন বিদ্যালয়ের সংখ্যাও গত বছরের তুলনায় কমেছে বলে মন্ত্রী জানান।
মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক মো. আবুল কাশেম মিয়া বলেন, 'আমি মনে করি, এবারে গণিত ও বিজ্ঞানে ভালো করার কারণেই সার্বিক ফল ভালো হয়েছে। তা ছাড়া পরীক্ষা নিয়ে যে আতঙ্ক ছিল, ফলাফলে মনে হয়েছে তাও কেটে গেছে।
আন্তশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি ও ঢাকা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ফাহিমা খাতুন কালের কণ্ঠকে জানান, ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার গতবার ইংরেজি ও গণিতে ৮৭ ও বিজ্ঞানে ৯২ শতাংশ ছিল। আর চলতি বছর এই বোর্ডে গণিতে পাসের হার ৮৭ দশমিক ০৫, সাধারণ বিজ্ঞানে ৯৬ দশমিক ৭৮ ও সামাজিক বিজ্ঞানে ৯৮ দশমিক ৮৭ শতাংশ। তিনি বলেন, পরীক্ষার ফলে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার জন্য শিক্ষার্থীদের বিষয়ভিত্তিক দুর্বলতা চিহ্নিত করে বিশেষ ক্লাশ নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এর ফলে চলতি বছরের ফলাফলে প্রত্যেক বিষয়েই ফল ভালো হয়েছে।
ঢাকা বোর্ডের মতো অন্যান্য বোর্ডেও এবার গণিত ও বিজ্ঞানে ভালো করেছে শিক্ষার্থীরা। এর মধ্যে যশোর বোর্ডে বিজ্ঞানে ৯৮ দশমিক ১৭ এবং গণিত বিষয়ে পাসের হার ৯৩ দশমিক ০৯ শতাংশ। মূলত বিজ্ঞান, গণিত ও ইংরেজি বিষয়ে পাসের হার বেড়ে যাওয়ায় সার্বিক ফল ভালো হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
ঢাকা বোর্ডের চেয়ারম্যান বলেন, বর্তমানে শহরকেন্দ্রীক শিক্ষকদেরই শুধু নয়, গ্রামের শিক্ষকদেরও প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এতে করে শিক্ষকদের পাঠদান আধুনিক হয়েছে। আর এর সুফল ভোগ করছে শিক্ষার্থীরা। তিনি বলেন, 'প্রথম বছর এ পরীক্ষা নিয়ে অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে কোনো সচেতনতা ছিল না। কিন্তু যখন দেখল জেএসসি ও জেডিসি পরীক্ষা পাস না করলে নবম শ্রেণীতে ভর্তি হওয়া যায় না, তখনই পড়াশোনার জন্য ঝাঁকুনি দিয়ে ওঠল শিক্ষার্থীরা। আর অভিভাবকরাও শিক্ষার্থীদের চাপ দিতে থাকলেন।'
কুমিল্লা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক কুণ্ডু গোপী দাস কালের কণ্ঠকে বলেন, বিনা মূল্যে নির্ধারিত সময়ে শিক্ষার্থীদের কাছে পাঠ্যবই পেঁৗছে দেওয়া, টেলিভিশনে দেশের সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠদান প্রচার করাসহ নকলবিরোধী ব্যাপক প্রচারণাসহ বিভিন্ন উদ্যোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের কারণেই এই ফলাফল হয়েছে।
শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ গতকাল সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেছেন, ১৭টি মোবাইল ল্যাবরেটরি বিজ্ঞানের বিভিন্ন উপকরণ নিয়ে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এগুলো শিক্ষার্থীদের উৎসাহ দিয়েছে। ফলে বিজ্ঞানে শিক্ষার্থীর পাসের সংখ্যা বেড়েছে।
ভালো করার কারণ জানতে চাইলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক প্রাথমিক ও গণশিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, কিশোরদের অংশগ্রহণের হার ও পাসের হারের চিত্র বেশ ভালো দেখা যাচ্ছে। কিন্তু গ্রাম-শহরের বিদ্যমান বৈষম্য এখনো ঘুরে ঘুরে আসছে। এ অবস্থা থেকে অবশ্যই উত্তরণ ঘটাতে হবে।
মেয়েদের সংখ্যা কমছে : জেএসসি ও জেডিসিতে মোট ছাত্র অংশ নিয়েছে আট লাখ ৩৭ হাজার ১৭২ জন। এর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে সাত লাখ ১২ হাজার ১৮৯ জন। পাসের হার ৮৫.৭ শতাংশ। ছাত্রদের মধ্যে জিপিএ ৫ পেয়েছে ১৫ হাজার ৫৩৪ জন। অন্যদিকে মোট ছাত্রীর সংখ্যা ছিল ৯ লাখ ৬২ হাজার ৭৭৫ জন। এর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে সাত লাখ ৯৪ হাজার ৫৯৪ জন। পাসের হার ৮২.৫৩ শতাংশ। মেয়েদের মধ্যে জিপিএ ৫ পেয়েছে ১৫ হাজার ৩১৮ জন।
পাসের হারে মেয়েদের সংখ্যা কম হওয়াকে উদ্বেগজনক উল্লেখ করে রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, আগের বেশ কয়েকটি পাবলিক পরীক্ষায় মেয়েদের পাসের হার ছেলেদের চেয়ে বেশি ছিল। কিন্তু এখন মেয়েদের পাসের হার ছেলেদের চেয়ে কম দেখা যাচ্ছে। এর কারণ ব্যাখা করতে গিয়ে তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে মনে হয় মেয়েদের নিরাপত্তার বিষয়টি ভাবতে হবে। কারণ, এখন অনেক অভিভাবক তাঁদের মেয়েকে স্কুল কিংবা কোচিং সেন্টারে পাঠাতে নিরাপদ বোধ করেন না। এসব কারণে মেয়েদের পড়াশোনার প্রতি এক ধরনের ভীতি কাজ করে থাকতে পারে। তাঁর মতে, ঘরে-বাইরে প্রতিবন্ধকতা দূর করতে না পারলে সব ক্ষেত্রে মেয়েরা সাফল্য দেখাতে পারবে না।
ঝরে পড়া : প্রকাশিত ফলাফলে দেখা যায় ১৬.২৯ শতাংশ শিক্ষার্থী ফেল করেছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এরা অষ্টম শ্রেণীতেই ঝরে পড়েছে। প্রথম বছরের পরীক্ষার ফলাফলে প্রায় পাঁচ লাখ শিক্ষার্থী ঝরে পড়েছিল এই শ্রেণী থেকে। প্রথমবার হওয়ার সরকার তাদের মধ্যে সর্বোচ্চ তিন বিষয়ে ফেল করাদের এবার পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ দেয়। কিন্তু এবার যারা ফেল করেছে, তাদের কী হবে?
জানতে চাইলে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, গত বছরের চেয়ে এ বছর ফেল করা শিক্ষার্থী কমেছে ৮৩ হাজার ৩৮৮ জন। এ থেকে বোঝা যায় ক্রমশ ঝরে পড়ার হার কমছে। তবে এবার যারা ফেল করবে, তারা কী আবার অষ্টম শ্রেণীতে পরীক্ষা দেবে, না নবম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হবে_এসব বিষয়ে কয়েক দিন পরে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে মন্ত্রী জানান। আর গত বছর যেসব পরীক্ষার্থী ফেল করেছে, তাদের মধ্যে পাসের হার জানতে চাইলে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ফাহিমা খাতুন কালের কণ্ঠকে বলেন, এসব শিক্ষার্থীর পাসের হার আলাদা করা হয়নি। তবে এ ধরনের শিক্ষার্থীদের পাসের হার ভালো বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।
সংবাদটি পড়া হয়েছে ১৪ বার



