পাকিস্তানের হাত ধরে আবার ক্রিকেট কলঙ্কিত! এবার সন্দেহের তীর পাকিস্তানের অধিনায়ক সালমান বাট, উইকেটরক্ষক কামরান আকমল, নতুন বলের দুই বোলার মোহাম্মদ আসিফ ও মোহাম্মদ আমেরসহ সাতজনের দিকে। বিখ্যাত ব্রিটিশ ট্যাবলয়েড 'নিউজ অব দ্য ওয়ার্ল্ড'-এর দাবি, একটি জুয়াড়ি চক্রের সঙ্গে জড়িত পাকিস্তানের ক্রিকেটাররা লর্ডসে গতকাল শেষ হওয়া চতুর্থ টেস্টে ইচ্ছাকৃতভাবে নো বল করেছেন! এই ন্যক্কারজনক ঘটনার নেপথ্যে ছিলেন মাজহার মাজিদ নামের এক 'দালাল'। তাঁকে দেড় লাখ পাউন্ড (২ লাখ ৩০ হাজার মার্কিন ডলার) দিয়েই ঘটনাটা 'সাজিয়েছে' সাপ্তাহিক ট্যাবলেয়ডটি! ম্যাচ পাতানোর সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে মাজহারকে গ্রেপ্তারও করেছে ব্রিটিশ পুলিশ।
২০০০ সালে সেলিম মালিকের সেই কলঙ্কিত ঘটনারও স্থপতি ছিল 'নিউজ অব দ্য ওয়ার্ল্ড'। সেবার তাদের দুজন রিপোর্টার বাজিকর সেজে পাকিস্তানের সাবেক অধিনায়কের সঙ্গে দেখা করে তাঁকে ম্যাচ পাতানোয় রাজি করিয়েছিলেন। পরে পত্রিকাটি সেই ঘটনা ফাঁস করে দেওয়ায় আজীবন নিষেধাজ্ঞার শাস্তি নিয়ে মাথা নিচু করে জীবন কাটাতে হচ্ছে মালিককে। এর আগে ইংল্যান্ড রাগবি দলের অধিনায়ককেও ফাঁসিয়েছিল ব্রিটেনের জনপ্রিয় ট্যাবলয়েডটি। এবার তাদের শিকার সালমান বাট ও তাঁর সতীর্থরা।
এবারও বাজিকর বা জুয়াড়ি সেজেই কাজ হাসিল করেছে তারা। প্রথমে তাদের কয়েকজন রিপোর্টার 'ডিপোজিট' হিসেবে ১০ হাজার পাউন্ড দিয়েছেন মাজহার মাজিদকে। এরপর বুধবার পশ্চিম লন্ডনের একটি হোটেলের রুমে দেখা করেন তাঁরা। পত্রিকাটির ভাষ্য অনুযায়ী, বাকি এক লাখ ৪০ হাজার পাউন্ড 'এন্ট্রি টিকিট' হিসেবে মাজহারকে দিয়েই রুমে প্রবেশাধিকার পেয়েছেন ওই রিপোর্টাররা। ম্যাচে আসিফ-আমির যে অন্তত তিনটি নো বল করবেনই তাঁদেরকে সেই প্রতিশ্রুতিই দেন মাজহার! পরে মাজহার এবং সালমান বাটের সঙ্গে ছবিও তুলেছেন এক রিপোর্টার। টেবিলে অনেকগুলো বান্ডিল রেখে টাকা গুনতে ব্যস্ত মাজহারের ছবিও প্রকাশ করেছে 'নিউজ অব দ্য ওয়ার্ল্ড'।
মাজহারের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার অর্থাৎ টেস্টের প্রথম দিনেই দুটো নো বল হয়েছে। প্রথমটি করেছেন আমের, ম্যাচের তৃতীয় ওভারের প্রথম বলে। এরপর দশম ওভারের শেষ বলটি করার সময় আসিফের পা পড়েছে দাগের বাইরে। পরদিন অর্থাৎ শুক্রবার আমেরের তৃতীয় ওভারের তৃতীয় বলটিও ছিল নো। গ্রেপ্তার হওয়ার পর মাজহার অবশ্য বাট-আসিফ-আমেরদের বাঁচানোর চেষ্টাই করেছেন। সেই সঙ্গে জানিয়েছেন, অবৈধ পথে পাওয়া টাকাগুলো রাখার জন্য পাকিস্তানের কয়েকজন ক্রিকেটারকে সুইস ব্যাংকে অ্যাকাউন্টও খুলে দিয়েছেন তিনি!
মাজহারের সঙ্গে পাকিস্তানের ক্রিকেটারদের 'সম্পর্ক' অবশ্য বেশ পুরনোই। এ বছরের শুরুতে আলোচিত সিডনি টেস্ট গড়াপেটাতেও নাকি তাঁর বড় ভূমিকা ছিল! গ্রেপ্তার হওয়ার পর সে কথা নির্দ্বিধায় স্বীকারও করেছেন তিনি, 'সিডনিতে দ্বিতীয় টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসে মাত্র ২ উইকেট হাতে নিয়ে ১০ রানের লিড ছিল অস্ট্রেলিয়ার। কিন্তু তারপরই নাটকীয়ভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল অস্ট্রেলীয়রা।' মাজহারের দেওয়া তথ্যে অবশ্য কিছুটা ভুল আছে। ১০ নয়, অষ্টম উইকেট পড়ার সময় অস্ট্রেলিয়া এগিয়েছিল ৫১ রানে। এরপরই পিটার সিডলকে (৩৮) সঙ্গে নিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে ১২৩ রানের জুটি গড়ে তোলেন মাইক হাসি। কামরান আকমলের ব্যর্থতায়(!) তিন-তিনবার 'জীবন' পাওয়া হাসি (১৩৪*) আউটই হননি সেই ইনিংসে। শেষ পর্যন্ত ১৭৫ রানের লিড পাওয়া স্বাগতিকরা পাকিস্তানকে ১৩৯ রানে গুঁড়িয়ে দিয়ে ম্যাচের পাশাপাশি সিরিজ জয়ও নিশ্চিত করেছিল। সেবার অস্ট্রেলীয়দের সাফল্য বাজিকর চক্রকে কিভাবে মোটা অঙ্কের টাকা পাইয়ে দিয়েছিল সেই তথ্যও ফাঁস করে দিয়েছেন মাজহার, 'ওই ম্যাচে পাকিস্তানের হার এবং অস্ট্রেলিয়ার জয়ের পক্ষে বাজির দর ছিল ৪০:১। আমরা চেয়েছিলাম ওরা (অস্ট্রেলিয়া) যেন অন্তত ১৫০ রানের লিড পাওয়ার পর পাকিস্তান হেরে যায়। সেটা হওয়ায় ১৩ লাখ ডলার কামাতে পেরেছিলাম আমরা।'
অর্থাৎ পাকিস্তান হেরে গেলেই যে সে দেশসহ বিশ্ব ক্রিকেটাঙ্গনের অনেকের মনেই ম্যাচ পাতানোর সন্দেহ উঁকি দেয়, তা পুরোপুরি অমূলক নয়। 'ভদ্রলোকের খেলা' ক্রিকেটে যে আজ পাতানো খেলার শেকড় গভীরভাবে প্রোথিত, তার পেছনে পাকিস্তানের ক্রিকেটারদের লোভী মানসিকতাই বোধহয় সবচেয়ে বেশি দায়ী। ক্রিকেটদুনিয়া থেকে কবে যে এই বিষবৃক্ষের উৎপাটন হবে, কে জানে! এএফপি, ইন্টারনেট।
সংবাদটি পড়া হয়েছে ৫ বার



