দেশের জনশক্তি রপ্তানি কমছেই। গত বছরের তুলনায় এ বছরের গত ৭ মাসে জনশক্তি রপ্তানি প্রায় ২০ ভাগ কমেছে। একই সঙ্গে গত চার মাস ধরেই কমতে শুরু করেছে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবৃদ্ধিও (রেমিটেন্স)। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সালের প্রথম ৭ মাসে ২ লাখ ৮৮ হাজার ৯২৫ জন কর্মী বিদেশ গিয়েছিলেন। এ বছরের গত ৭ মাসে এ সংখ্যা ২ লাখ ৩১ হাজার ১৭১ জন। এক বছরে ৫৭ হাজার ৭৫৪ কর্মী কম বিদেশ গেছেন। ২০০৭ সালে ৮ লাখ ৩২ হাজার ৬০৯ জন ও ২০০৮ সালে ৮ লাখ ৭৫ হাজার ৫৫ জন কর্মী বিদেশ গিয়েছিলেন। ২০০৯ সালে এ সংখ্যা কমে হয় ৪ লাখ ৭৫ হাজার ২৭৮ জন। বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রনালয় তথ্য অনুযায়ী, বিশ্ব মন্দার কারণে ২০০৯ সালে জনশক্তি রপ্তানি কমে আসে। তবে বর্তমানে জনশক্তি রপ্তানি কমে যাওয়ার কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ সংশ্লিষ্টরা বলতে পারছেন না। অনেকের মতে, নির্দিষ্ট কয়েকটি বাজারের দিকে ঝুঁকে থাকার কারণেই এ সমস্যা হচ্ছে। নতুন নতুন শ্রম বাজারে প্রবেশ করতে না পারলে সামনে এ সংখ্যা আরো কমবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে জনশক্তি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন-বায়রার মহাসচিব আলী হায়দার চৌধুরী বলেন, হঠাৎ করে একদিনে জনশক্তি রপ্তানি কমেনি। অনেকদিন ধরেই কমছে। এর মূল কারণ প্রচলিত বাজারগুলো চালু হচ্ছে না। সৌদি আরব, মালয়েশিয়া, কুয়েত, কাতার এগুলো বাংলাদেশের আসল বাজার। এ বাজারগুলোর উপরেই নির্ভর করছে জনশক্তি রপ্তানি খাতের ভবিষ্যত। এ বাজারগুলো চালু হলেই জনশক্তি রপ্তানি বাড়বে।
বাজারগুলো চালু হচ্ছে না কেন জানতে চাইলে বায়রার মহাসচিব বলেন, কোন বাজার বন্ধ হয়ে যেতে সময় লাগে না। কিন্তু চালু করতে সময় লাগে। ওই বাজারগুলো চালু করার জন্য সরকারি ও বেসরকারিভাবে যৌথ প্রচেষ্টা চলছে।
এ ব্যাপারে বিএমইটির মহাপরিচারক খোরশেদ আলম চৌধুরী বলেন, বন্ধ বাজারগুলো চালু করার জন্য সরকারি সব প্রচেষ্টাই অব্যাহত আছে। একই সঙ্গে নতুন নতুন বাজার খোঁজার চেষ্টা চলছে। বিভিন্ন দূতাবাসে চিঠি দিয়ে বাজারের সার্বিক খোঁজখবর নেয়া হচ্ছে। বছরের বাকি মাসগুলোতে জনশক্তি রপ্তানি বাড়বে বলে আশা করেন তিনি। সব মিলিয়ে এ বছর ৪ লাখ বিদেশ যাবেন বলে আশা করেন তিনি।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা মীর্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, গত কয়েক বছরে লোক যাওয়া কমেছে। অনেক লোক ফেরতও আসছে। এগুলো রেমিটেন্স কমে যাওয়ার কারণ হতে পারে। তবে কারণ যাই হোক সেটা অনুসন্ধান করা জরুরি। কূটনীতিক কোন দুর্বলতার কারণে বিদেশে লোক যাওয়া কমলে সেটি খুঁজে বের করতে হবে। বিদেশে দক্ষ কর্মী পাঠানোর দিকে বেশি নজর দিতে হবে। কারণ দক্ষ কর্মী গেলেই রেমিটেন্স বেশি আসবে।
কমছে জনশক্তি রপ্তানি:
গত বছরের জানুয়ারিতে ৫০ হাজার ৬শ ৩২ জন কর্মী বিদেশে গেছেন। এ বছরের জানুয়ারিতে তা কমে হয়েছে ৩৩ হাজার ৮শ ৪৭ জন। অর্থাৎ গত বছরের তুলনায় ৩৩ দশমিক ১৫ ভাগ রপ্তানি কমেছে। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে গিয়েছিলেন ৪৩ হাজার ৮৫৬ জন। এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে গেছেন ২৭ হাজার ৪৯ জন। গত বছরের মার্চে গিয়েছিলেন ৪২ হাজার ৯শ ৪৫ জন। এ মার্চে গেছেন ৩৮ হাজার ২৪৪ জন। গত এপ্রিলে গিয়েছিলেন ৩৯ হাজার ৪৯ জন। এ এপ্রিলে গেছেন ৩৫ হাজার ৬৪৭ জন। গত জুনে গেছেন ৩৮ হাজার ৫৬৮ জন। এ জুনে গেছেন ৩৪ হাজার ৭৯৮ জন। গত জুলাইয়ে গিয়েছিলেন ৩৮ হাজার ২৫ জন। এ জুলাইয়ে গেছেন ২৮ হাজার ৩৪৭ জন।
কমছে রেমিটেন্সও:
এ বছরের জানুয়ারিতে ৬ হাজার ৫৮৭ দশমিক ৬৮ কোটি টাকার রেমিটেন্স আসে। পরের মাসে তা কমে গিয়ে হয় ৫ হাজার ৭৩৬ দশমিক ৯৩ কোটি টাকা। এরপর মার্চে কিছুটা বাড়লেও এপ্রিল থেকে রেমিটেন্স কমতে শুরু করে। মার্চে ৬ হাজার ৬২৩ দশমিক ৬৯ কোটি, এপ্রিলে ৬ হাজার ৩৮৬ দশমিক ৮৮ কোটি, মে মাসে ৬ হাজার ২৫৮ কোটি দশমিক ১৪ কোটি, জুনে ৬ হাজার ১৮৭ দশমিক ৯৫ কোটি এবং জুলাইতে আরো কমে ৫ হাজার ৮৭৯ দশমিক ২ কোটি টাকার রেমিটেন্স এসেছে। গত বছরের জুনের তুলনায় এ বছরের জুনে ২ দশমিক ৫০ ভাগ এবং গত বছরের জুলাইয়ের তুলনায় এ বছরের জুলাইয়ে ৩ দশমিক ৮৫ ভাগ রেমিটেন্স কম এসেছে।
দুবাইয়ে কমছে, লিবিয়ার বাজার বন্ধ:
সৌদি আরব, মালেয়শিয়া, কুয়েতসহ বাংলাদেশের প্রধান কয়েকটি বাজার বন্ধ থাকায় বাংলাদেশের জন্য গত কয়েক বছরের বিকল্প বাজার ছিলো সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই ও লিবিয়া। কিন্তু গত দুই মাস ধরে হঠাৎ করেই লিবিয়ার বাজার বন্ধ। এ বছরের শুরুতে যেখানে গড়ে আড়াই থেকে তিন হাজার লোক লিবিয়া গেছেন সেখানে জুনে মাত্র ৩৮৯ জন কর্মী লিবিয়া গেছেন। জুলাইয়ে এ সংখ্যা ছিলো শুন্য।
২০০৯ সালে দুই লাখ ৫৮ হাজার ৩৪৮ জন কর্মী সংযুক্ত আরব আমিরাত গিয়েছিলেন। জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ৭ মাসে সেখানে গিয়েছিলেন ১ লাখ ৫১ হাজার ৫৫ জন কর্মী। কিন্তু এ বছরের গত ৭ মাসে সেখানে গেছেন ১ লাখ ২২ হাজার ৮০২ জন কর্মী। অর্থাৎ প্রায় ২০ হাজার কর্মী কম গেছেন।
নতুন বাজার নেই, বন্ধগুলোও চালু হয়নি:
কয়েক বছর ধরে প্রায় বন্ধ থাকা সৌদি আরব, মালেয়শিয়া ও কুয়েতের বাজার এখনো বন্ধই আছে। একই সময় নতুন কোন বাজারও চালু হয়নি। ফলে শ্রম বাজারও সংকুচিত হয়ে পড়ছে। ক্রমেই ছোট হয়ে আসছে বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানির বাজার।
সংবাদটি পড়া হয়েছে ১৩ বার




