নেদারল্যান্ডসে আসার কথা ই-মেইলে জানানোর সঙ্গে সঙ্গেই একজন বড় ভাই ফিরতি মেইলে বললেন, আমস্টারডাম রেডলাইট ডিস্ট্রিক্টে একটা চক্কর দিতে ভুলবে না কিন্তু!
বেশ জোর দিয়েই বললেন। তার কথা শুনে আমি রীতিমতো অবাক। রেডলাইট এরিয়া বলতে আমরা সাধারণত যেটা বুঝি, সেখানে যাওয়ার জন্য এত জোরালো রিকমেন্ডেশনের মাজেজা বুঝলাম না। বোঝার কথাও নয়। হল্যান্ড বা নেদারল্যান্ডসের রাজধানী আমস্টারডাম শহরের চরিত্র বোঝাতে হলে এক কথায় বলতে হয়, এটা সাইকেল, ক্যানেল (খাল) আর রেডলাইট ডিস্ট্রিক্টের শহর। প্রতিদিন পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসছে হাজারো টুøরিস্ট। এক একটি দোকান, সেখানে সাজানো পণ্য ও সাইনবোর্ড দেখতে দেখতে একপর্যায়ে অবাক হওয়ার ড়্গমতাও লোপ পায়।
রেডলাইট ডিস্ট্রিক্টের প্রবেশমুখেই চোখে পড়ল ‘ফার্স্ট সেক্স শপ’ লেখা একটি সাইনবোর্ড। এ রকম শত শত দোকানে যৌনতা বেচাকেনার পসরা সাজিয়ে বসে আছে ঝানু ব্যবসায়ীরা। তারা জানে, কীভাবে টুøরিস্টদের আকৃষ্ট করতে হয়। এই এলাকায় যৌনতাকে উপভোগ জন্য রয়েছে সব ধরনের আয়োজন। টাকার বিনিময়ে প্রত্যড়্গ অংশগ্রহণের পাশাপাশি পিপ শো, লাইভ সেক্স শো, সেক্স চ্যাট, শেক্স শপ, পর্নো মুভি- কী নেই! কদমে কদমে পড়বে এ ধরনের দোকান।
একটি সেক্স শপের সামনে দাঁড়িয়ে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করার চেষ্টারত বয়স্ড়্গ এক ডাচের সঙ্গে আলাপ জমালাম। দেশ থেকে নিয়ে আসা বেসনসের একটি প্যাকেট তার হাতে গুঁজে দিয়ে আলাপ চালিয়ে যাই। সে জানায়, এখানে ১৫-২০ মিনিটের জন্য একটি মেয়ের শরীর কিনতে হলে খরচ করতে হবে কমপড়্গে ৫০ ইউরো। নারীদেহের মানভেদে এই দাম ১৫০ ইউরো পর্যন্ত হতে পারে। ১৮ থেকে ২৪ বছরের মেয়েদের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। এখানে পশ্চিম ইউরোপের মেয়ের সংখ্যা খুবই কম। বেশির ভাগই এসেছে রাশিয়া, পোল্যান্ড, পর্তুগাল, থাইল্যান্ড, নেপাল ও ইন্ডিয়া থেকে। প্রতি মিনিট পিপ দুই ইউরো। এখানে একটি ছোট কাচের কেবিনে ঢুকে পয়সা ফেললেই এক মিনিটের জন্য অস্বচ্ছ কাচের জানালাটি স্বচ্ছ হয়ে যাবে। এই জানালা দিয়ে প্রত্যড়্গ করা যাবে কামলীলা। লাইভ সেক্স শোয়ের ব্যাপারটাও এ রকমই। তবে আয়োজন আরও ভালো (!)। ২০-৩০ মিনিটের জন্য খরচ করতে হবে ৩৫ থেকে ৪৫ ইউরো। অতি বিত্তবানদের জন্য রয়েছে ‘প্রাইভেট শো’।
রেডলাইট ডিস্ট্রিক্টের অলিগলিতে আছে হাজারো পর্দাঘেরা ছোট ছোট কাচের জানালা। এসব জানালার পেছনেই দাঁড়িয়ে থাকে স্বল্পবসনা সুন্দরীরা। দরে বনলে খদ্দেরকে নিয়ে ভেতরে চলে যায় তারা। বিকেল থেকেই শুরু হয়ে যায় নারীদেহের বিকিকিনি। চড়া প্রসাধনচর্চিত নারীরা লাস্যময়ী ভঙ্গিতে ডাকতে থাকে সম্্ভাব্য খদ্দেরকে। চোখ-ধাঁধানো একেকটি রূপসীর দিকে তাকিয়ে ভাবি, আপাত হাস্যমুখের আড়ালে কি উঁকি দিচ্ছে বিষণ্নতা! কী জানি, আমার বোঝার ভুল হওয়া খুবই সম্্ভব। পৃথিবীর প্রাচীনতম পেশার এই নগ্ন উপস্থাপন আমার অনভ্যস্ত চোখে বড় দৃষ্টিকটু লাগে। একেকটি গলি পেরিয়ে অন্য গলিতে গিয়ে ঢুকি। সেখানেও একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি।
এ রকমই একটি গলিতে চোখে পড়ল একটি ইন্ডিয়ান রেস্তোরাঁ ‘কামসূত্র’। এই এলাকায় একটি ভারতীয় রেস্তোরাঁর নাম এর চেয়ে ভালো আর কী হতে পারে!
রেডলাইট ডিস্ট্রিক্টের অলিগলিতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে অনেকগুলো ‘কফি শপ’। নাম দেখে বিভ্রান্ত হয়ে এসব ‘কফি শপে’ কফি পানের আশায় প্রবেশ করলে বোকা বনবেন নিশ্চিত। এসব কফিশপ বিখ্যাত হচ্ছে আইনসিদ্ধভাবে গাঁজা সেবনের জন্য। রীতিমতো মেনুø কার্ড ছাপিয়ে তারা বিক্রি করছে নানা ধরনের মাদক। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আমদানি করা মাদকের মাত্রা এবং পরিমাণের ওপর নির্ভর করছে দাম। কৌতূহল মেটাতে এমনই একটি কফি শপে ঢুকে ঘুরঘুর করছি, এমন সময় ষন্ডামতো বিশালদেহী এক লোক এসে জানতে চাইল, আমি কিছু খঁুজছি কি না। মুখের কথা যা-ই হোক, আমি তার আচরণ এবং চোখের ভাষায় বুঝতে পারলাম, দরকার না থাকলে এখান থেকে মানে মানে কেটে পড়াই উত্তম।
এই রেডলাইট ডিস্ট্রিক্টেই শুনতে পেলাম গির্জার ঘণ্টার গুরুগম্্ভীর মিষ্টি শব্দ। এখানে আছে বেশ কয়েকটি অপূর্ব স্থাপত্যের প্রাচীন গির্জা। ঈশ্বরবন্দনা আর আদিম পেশা এখানে চলছে হাতে হাত ধরে।
আবু নাসের মুহাম্মদ
সংবাদটি পড়া হয়েছে ৮৫ বার



