আপনার একাউন্ট
sitlogo
তাজা খবরঃ
loading...
সোমবার, মে ২১, ২০১২
বিস্তারিত সংবাদ

ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) ৫৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে কিছু কথা-আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী

উনিশশ’ সাতান্ন সালের ২৭ জুলাই। শুধু বাংলাদেশ নয়, সারা উপমহাদেশের রাজনীতিরই একটি ঐতিহাসিক ক্রাি-কাল শুরু হওয়ার দিন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের অঙ্কুরোঞ্ছগমের দিনগুলোর মধ্যে এটিকে আমি একটি প্রধান দিন বলে অভিহিত করব। এইদিন ঢাকার রূপমহল সিনেমা হলে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (অবিভক্ত) জন্ম। তখনকার অবিভক্ত পাকি-ানের পূর্ব ও পশ্চিম উভয় অংশের প্রখ্যাত জননেতারা এই নতুন দলে যোগ দেন। এই দলে পূর্ব পাকি-ান থেকে মওলানা ভাসানী, অধ্যাপক মোজাফ্‌ফর আহমদ, অলি আহাদ, মোহাম্মদ তোহা, পীর হাবিবুর রহমান, প্রফেসর আসহাব উদ্দীন প্রমুখ নেতা যেমন যোগ দেন, তেমনি পশ্চিম পাকি-ান থেকে আবদুল গাফ্‌ফার খান, ওয়ালি খান, মাহমুদ আলী কাসুরি, মিয়া ইফতে খার উদ্দীন, আরিফ ইফতিয়ার, সিআর আসলাম, আতাউল্লা খান মোঙ্গল, গউস বখশ, বেজেঞ্জো, খয়ের বখশ মারী প্রমুখ এসে অংশ নেন।

তৎকালীন পূর্ব পাকি-ানের আরেকটি মোটামুটি শক্তিশালী দলের (গণতন্ত্রী দল) নেতারা, যেমন আবদুর রব সেরনিয়াবাত, মাহমুদ আলী, মহিউদ্দীন আহমদ, হাজী দানেশ, এম আতাউর রহমান নিজেদের দলের বিলুপ্তি ঘটিয়ে ন্যাপের অঙ্গীভূত হয়ে যান। মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী হন এই নবজাত দলটির সভাপতি। এই ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিকেই বলা চলে একটি শক্তিশালী সর্ব পাকি-ানি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল। এ সময় আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকি-ানে সর্বাধিক শক্তিশালী দল হওয়া সত্ত্বেও পশ্চিম পাকি-ানে তার তেমন শক্ত ভিত্তি ছিল না।

ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির জন্ম উপমহাদেশের এক ঐতিহাসিক ক্রাি-লগ্নে এবং ঐতিহাসিক প্রয়োজনে। ন্যাপের জন্ম শুধু পাকি-ান এবং পরবর্তীকালে বাংলাদেশের রাজনীতিকেই প্রভাবিত করেনি, সারা উপমহাদেশের রাজনীতিকে প্রভাবিত করেছে একথা বিনা দ্বিধায় বলতে পারি। আজ হয়তো ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি আগের মতো শক্তিশালী দল নয় এবং দেশের জনজীবনে তার আগের মতো প্রভাব নেই; কিন্তু পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে উপমহাদেশের রাজনৈতিক দিক পরিবর্তনে এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সূচক শক্তি হিসেবে দলটি যে বিরাট ভূমিকা রেখেছে, তার ঐতিহাসিক সত্যতা অনস্বীকার্য।

আমার এ কথাটি ব্যাখ্যা করতে হলে একটু পিছিয়ে যেতে হবে। ১৯৫৬ সালে কাগমারিতে আওয়ামী লীগের কিংবদি-তুল্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী জাতীয় সংসদে মাত্র তেরোজন দলীয় সদস্য নিয়ে প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইসকান্দার মির্জার ক্রীড়নক রাজনৈতিক দল রিপাবলিকান পার্টির সঙ্গে হাত মিলিয়ে কেন্দ্রে কোয়ালিশন মন্ত্রিসভা গঠন করেন এবং নিজে প্রধানমন্ত্রী হন। অন্যদিকে পূর্ব পাকি-ানেও তখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়।

আওয়ামী লীগের জন্ম মূলত পূর্ব পাকি-ানের জন্য স্বায়ত্তশাসন অর্জন, তার ভাষা, সংস্ড়্গৃতির অি-ত্ব ও অধিকার রক্ষা এবং সাম্প্রদায়িকতা ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতার সুস্পষ্ট লক্ষ্য নিয়ে। এই সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতা থেকে পূর্ব পাকি-ানের বামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো আমেরিকার সঙ্গে সামরিক চুক্তি করার তীব্র নিন্দা এবং স্বাধীন ও নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণের দাবি জানিয়ে আসছিল। এই বামপন্থীদের এক বিরাট অংশই ছিল আওয়ামী লীগে এবং আওয়ামী লীগও সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সঙ্গে সামরিক চুক্তি করার তীব্র বিরোধী ছিল। পাকি-ানের ১৯৫৬ সালের সংবিধানে পশ্চিম পাকি-ানের সিন্ধী, পাঠান, বালুচি জাতিসত্তাগুলো বিলুপ্ত করে যে এক ইউনিট প্রথা তাদের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয় এবং পূর্ব পাকি-ানের জনগণের সংখ্যাগরিষ্ঠতা কেটে প্যারিটি বা সংখ্যাসাম্যের ব্যবস্থা করা হয়, আওয়ামী লীগসহ পূর্ব পাকি-ানের সব দল ছিল তার বিরুদ্ধে। পূর্ব পাকি-ানের জন্য পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি তো আওয়ামী লীগের প্রধান দাবি হয়ে ওঠে।

কিন্তু শহীদ সোহরাওয়ার্দী কেন্দ্রে প্রধানমন্ত্রীর পদ গ্রহণ করেই এক ইউনিট ও পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে দলের কমিটমেন্ট থেকে সরে আসেন। তিনি সামরিক চুক্তির পক্ষে জোর সমর্থন দেন এবং এক ইউনিট সম্পর্কে ঘোষণা করেন, “ঙহব ঁহরঃ রং সু ধৎঃরপষব ড়ভ ভধরঃয” (এক ইউনিট আমার ঈমানের অঙ্গ)। পূর্ব পাকি-ানের আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনাধিকার সম্পর্কে বলেন, এই স্বায়ত্তশাসনাধিকারের শতকরা ৯৮ ভাগ তো দেয়াই হয়ে গেছে। তার এই স্বেচ্ছাচারমূলক উক্তি এবং দলের গণতান্ত্রিক ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী কমিটমেন্ট থেকে সরে আসার নীতি আওয়ামী লীগের ভেতরেও ক্ষোভ ও অসে-াষ সৃষ্টি করে এবং দলের বাম অংশ মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে সংগঠিত হয়। প্রথম সুয়েজ যুদ্ধে এবং ওমানে ব্রিটিশ আগ্রাসনের সময় শহীদ সোহরাওয়ার্দী সাম্রাজ্যবাদীদের পক্ষে যে ভূমিকা নেন এবং মধ্যপ্রাচ্যের সাম্রাজ্যবাদবিরোধী মুসলিম দেশগুলোর শক্তিকে ‘জিরো প্লাস জিরো ইকুয়াল টু জিরো’ বলে যে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করেন, তাতে দলের ভেতর অসে-াষ তীব্র আকার ধারণ করে।

এই অসে-াষই কাগমারী সম্মেলনে বিদ্রোহে রূপা-রিত হয়। স্বাধীন ও নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি ও পূর্ব পাকি-ানের পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নে শহীদ সোহরাওয়ার্দী দলের পূর্বঘোষিত কমিটমেন্টে ফিরে আসতে রাজি হননি। ফলে এই বিদ্রোহী বাম অংশই দল থেকে বেরিয়ে এসে ১৯৫৭ সালের ২৭ জুলাই ঢাকার রূপমহল সিনেমা হলে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির জন্ম দেয় এবং দলটি আওয়ামী লীগের প্রায় সমকক্ষ শক্তিশালী ও জনপ্রিয় দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। অনেকের মতে, আওয়ামী লীগের কাগমারী সম্মেলনই ছিল ন্যাপের সূতিকাগার।

অনেক রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মনে করেন, পঞ্চাশের দশকের শেষদিকে ন্যাপের জন্ম জাতীয় ও আ-র্জাতিক রাজনীতির মোড় ফেরার এক সন্ধিক্ষণে পূর্ব পাকি-ানে গণতান্ত্রিক শক্তিকে দ্বিধাবিভক্ত ও দুর্বল করেছে। কাগমারী সম্মেলনের পরিণতি দেখেই পশ্চিম পাকি-ানের সামরিক জা-া বুঝতে পেরেছিল, কাগমারী সম্মেলনে শহীদ সোহরাওয়ার্দী ভোটাভুটিতে জিতেছেন বটে, কিন্তু দলের শক্তিশালী অংশের ওপর কর্তৃত্ব হারিয়েছেন এবং পূর্ব পাকি-ানের জনমতও এখন বিভক্ত। এই মুহূর্তে শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিলে পূর্ব পাকি-ানে তার প্রতিবাদে কোন শক্তিশালী গণআন্দোলন গড়ে উঠবে না।

এ ধারণা থেকেই সামরিক জা-া (তাদের প্রতিনিধি প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইসকান্দার মির্জা) সাহস অর্জন করে এবং শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে অত্য- অবমাননাকরভাবে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরিয়ে দেয়। এটা ঘটে ন্যাপের আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠা লাভের আগেই। শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে অবমাননাকরভাবে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরিয়ে দেয়ার প্রতিবাদে আওয়ামী লীগ তখন কোন উল্লেখযোগ্য আন্দোলন দেশের কোন অংশেই গড়ে তুলতে পারেনি। দেশের- বিশেষ করে পূর্ব পাকি-ানের গণতান্ত্রিক শক্তি বিভক্ত হওয়ার সুযোগ গ্রহণে সামরিক জা-ার এই সাফল্যই তাকে পরবর্তী ধাপে পাকি-ানে গণতন্ত্র উচ্ছেদ ও সামরিক শাসন প্রতিষ্ঠায় সাহস জুগিয়েছে।

আবার তখনকার রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহলের আরেকটি অংশ মনে করেছে, শহীদ সোহরাওয়ার্দীর আপসবাদী ও সুবিধাবাদী নীতির ফলে আওয়ামী লীগ রাজনীতির লেফট-সেন্টার অবস্থান থেকে সরে যাওয়ায় এক্ষেত্রে যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছিল, ন্যাপ দ্রুত তা পূরণ না করলে গণতান্ত্রিক রাজনীতির এক বিরাট ক্ষতি হতো। কোন নেতাই তার শক্তির শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হলে নিজের পতন ঠেকাতে পারেন না। শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ক্ষেত্রেও এটা ঘটেছিল। নিজেকে নিজের শক্তির শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন করার পর ন্যাপ গঠিত হোক আর না হোক, সামরিক জা-া তাকে ক্ষমতা থেকে সরাতই। এ সময় ন্যাপ গঠিত হওয়ায় শহীদ সোহরাওয়ার্দী নিজের সঙ্গে গোটা গণতান্ত্রিক শক্তিকে পতনের গহ্বরে নিয়ে যেতে পারেননি, অ-ত তার একটি বিকল্প শক্তিশালী দুর্গ তখন তৈরি হয়েছে এবং টিকে রয়েছে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহলের দুই অংশের এই দুই অভিমতের কোন্‌টি সঠিক সেই বিতর্কে না গিয়ে বলা চলে, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির জন্ম এবং অতিদ্রুত শক্তিশালী ও জনপ্রিয় দলে পরিণত হওয়া এটাই প্রমাণ করে যে, পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনাধিকার অর্জন এবং সাম্প্রদায়িকতা ও সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা তখন পূর্ব পাকি-ানের আপামর মানুষের প্রাণের দাবি হয়ে উঠেছে। এই দাবি থেকে সরে গিয়ে আওয়ামী লীগেরও জনপ্রিয়তা ধরে রাখা সম্্‌ভব হতো না। হয়তো ন্যাপই পাকি-ানের উভয় অংশের মানুষের গণতান্ত্রিক আশা-আকাঙ্ক্ষার একমাত্র প্রতিনিধিত্বশীল রাজনৈতিক দল হয়ে উঠত।

এই সত্যটা বুঝতে পেরেছিলেন আওয়ামী লীগ দলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ফলে শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃতুøর পর তিনি দ্রুত দলের পুনরুজ্জীবন ঘটান এবং দলটিকে আগের লেফট-সেন্টার অবস্থানে ফিরিয়ে নেন। দলের ডানপন্থী প্রবীণ নেতাদের অধিকাংশই দল থেকে একে একে ঝরে পড়েন। ন্যাপের দাবি ছিল পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন। শেখ মুজিব আরও এক পা এগিয়ে তাকে বাঙালির স্বাধিকার দাবিতে রূপা-র করেন। সাম্প্রদায়িকতা ও সামরিক চুক্তির বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নেন। এমনও হতে পারত যে, নীতি ও কর্মসূচির ভিত্তিতে ন্যাপ ও আওয়ামী লীগের অত্য- কাছাকাছি আসার ফলে গোটা পাকি-ানেই সামরিক শাসনের উচ্ছেদ এবং গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সম্মিলিত দুর্বার গণআন্দোলন গড়ে উঠত। কিন্তু তার আগেই আ-র্জাতিক সমাজতান্ত্রিক শিবিরের অভ্য-রীণ কোন্দল ও সংঘাতে বাংলাদেশে বাম গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ঘটে যায় এক মহাবিপর্যয়।

সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীনের মধ্যে তত্ত্বগত এবং রাষ্ট্রীয় স্বার্থগত বিবাদ এ সময় তুঙ্গে ওঠে এবং তার প্রতিক্রিয়ায় পাকি-ানে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি চীনপন্থী ও মস্ড়্গোপন্থী এই দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। মওলানা ভাসানী চীনপন্থী অংশের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। অধ্যাপক মোজাফ্‌ফর আহমদের নেতৃত্বে থেকে যায় দলের মস্ড়্গোপন্থী অংশ। ন্যাপের দুই অংশ ভাসানী ন্যাপ ও মোজাফ্‌ফর ন্যাপ নামে পরিচিতি লাভ করে।

চীনের ইঙ্গিতে ভাসানী ন্যাপ পাকি-ানে সামরিক শাসকদের সমর্থন দিতে শুরু করে। মওলানা ভাসানী জানান, মাও ঝে দুং তাকে নির্দেশ দিয়েছেন- ‘ডোন্ট ডিসটার্ব আইয়ুব।’ সুতরাং সামরিক চুক্তিবিরোধী আন্দোলন ও পূর্ব পাকি-ানের স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন থেকে ভাসানী ন্যাপ আপাতত সরে দাঁড়ায় এবং ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকি-ান যুদ্ধের সময় সামরিক জা-ার যুদ্ধ প্রচেষ্টায় সহযোগিতা দেয়। মওলানা ভাসানী স্বয়ং রণাঙ্গন পরিদর্শন করে পাকি-ানের সেনাবাহিনীর গার্ড অব অনার গ্রহণ করেন।

এই যুদ্ধের পরের বছরই শেখ মুজিব পূর্ব পাকি-ানের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনাধিকারের ভিত্তিতে তার ঐতিহাসিক ছয় দফা ঘোষণা করেন। মোজাফ্‌ফর ন্যাপ ছয় দফা আন্দোলনে সমর্থন দেয় এবং ভাসানী ন্যাপ তার বিরোধিতা করে। ভাসানী-আইয়ুব এক গোপন বৈঠকের চুক্তি অনুসারে জেলে বন্দি ভাসানী ন্যাপের নেতাকর্মীদের মুক্তি দেয়া হয় এবং তারা ছয় দফার সক্রিয় বিরোধিতায় মাঠে নামেন। এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটে শেখ মুজিবসহ ৩৯ জন সামরিক, বেসামরিক অফিসার ও রাজনীতিকের বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা শুরু হওয়ার পর। এ মামলা প্রত্যাহার এবং ছয় দফা ও এগারো দফা দাবির ভিত্তিতে ’৬৯ সালে যে গণঅভুøত্থান ঘটে, তাতে মোজাফফর ন্যাপের সংযুক্তি তো ছিলই, মওলানা ভাসানীও তার দলের রাহুদের কবলমুক্ত হয়ে তাতে নেতৃত্ব দিতে এগিয়ে আসেন। শেষ পর্য- তিনি তার দলের ঊর্ধ্বতন কোটারি-নেতৃত্বকে অগ্রাহ্য করে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার প্রারম্্‌েভই ভারতে চলে যান এবং মুজিবনগর সরকারের উপদেষ্টা পরিষদে সিপিবি ও মোজাফফর ন্যাপের সঙ্গে একসঙ্গে অংশগ্রহণ করেন।

১৯৬৫ সালে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি যখন তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বে ভাগ হয়, তখন মওলানা ভাসানীর ব্যক্তিত্ব ও নেতৃত্বের মোকাবেলায় অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের নেতৃত্বে দলের অপর অংশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অনেকেই সন্দিহান ছিলেন। অধ্যাপক মোজাফ্‌ফরও ছিলেন অর্থনীতির অধ্যাপক এবং রাজনীতিতে নবাগত। অধ্যাপক হিসেবে এই সদাহাস্যমুখ সুদর্শন মানুষটি পপুলার ছিলেন। রাজনীতিতেও দেখা গেল তিনি সব প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে সংগঠনের হাল ধরতে জানেন। রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনুকূল থাকলে হয়তো মোজাফফর ন্যাপই আজ থাকত বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক দল এবং অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ হতেন বঙ্গবন্ধুর পর দেশের আরেক শীর্ষ নেতা।

১৯৬৯ সালে গণঅভুøত্থানের পর বঙ্গবন্ধু যখন প্রেসিডেন্ট আইয়ুবের দ্বারা আহূত রাওলাপিণ্ডির গোলটেবিল বৈঠকে যোগ দেন, তখন সেই বৈঠকে পূর্ব পাকি-ানের দ্বিতীয় শীর্ষ প্রতিনিধি ছিলেন অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ। গোলটেবিল বৈঠকে আইয়ুবের সঙ্গে আপসে অসম্মত হয়ে দু’নেতাই যখন ঢাকায় ফিরে আসেন, তখন বিমানবন্দর থেকে কয়েক মাইল দীর্ঘ দুই নেতার সংবর্ধনা মিছিল আমিও দেখেছি। বঙ্গবন্ধুর পেছনের খোলা ট্রাকেই জনতার অভিবাদন গ্রহণরত এই নেতাকেও আমি দেবদারু বৃক্ষের মতো শির উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সিপিবি ও মোজাফফর ন্যাপের অবদান অসামান্য। অধ্যাপক মোজাফ্‌ফর এবং কমরেড মনি সিংহ বারবার মস্ড়্গোতে না দৌড়ালে এই মুক্তিযুদ্ধে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের দ্বিধাহীন ও সক্রিয় সমর্থন কতটা আদায় করা যেত, তা এখনও সন্দেহের বিষয়। স্বাধীনতা-উত্তর দেশ গঠনেও ন্যাপ এবং অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ যে গঠনমূলক ভূমিকা রেখেছেন এবং বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগকে- বাকশাল জমানা পর্য- যে সমর্থন ও সহযোগিতা দিয়েছেন, তা এক কথায় অভূতপূর্ব। এই ভূমিকার জন্যই হয়তো ন্যাপ তার আগের গৌরব হারালেও এখনও টিকে আছে এবং অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ ৮৯ বছর বয়সেও বেঁচে আছেন এবং দল ও দেশকে এখনও দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন।

ভারত স্বাধীন হওয়ার পর নেহরু সমাজতন্ত্রী নেতা জয় প্রকাশ নারায়ণকে ডেকে বলেছিলেন, ‘নারায়ণজী, আপনি হয় আমার মন্ত্রিসভায় যোগ দিন, নইলে পার্লামেন্টে এসে শক্তিশালী বিরোধী দল গঠন করুন। গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে গঠনমূলক বিরোধিতার স্থানটি শূন্য থাকলে অগণতান্ত্রিক এবং ধ্বংসাত্মক অপশক্তি এসে সেই স্থান দখল করে।’ নেহরুর এই সতর্কবাণী বাংলাদেশের বেলায় সত্য হয়েছে বলা চলে।

সিপিবি’র পরামর্শে ন্যাপ-মোজাফফর যদি স্বাধীনতা-উত্তর আওয়ামী লীগ সরকারের দ্বিতীয় গ্রেডের সহযোগী দল না হয়ে প্রথম গ্রেডের বিরোধী দল হওয়ার চেষ্টা করত এবং অধ্যাপক মোজাফফর সুযোগ পেতেন সংসদের ভেতরে ও বাইরে সেই গঠনমূলক গণতান্ত্রিক বিরোধিতার নেতৃত্ব গ্রহণের, তাহলে বাংলাদেশে আজ এই অবস্থা দেখা দিত কিনা, সেটাও এক বড় রকমের বিতর্কের বিষয়। তবু ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির ৫৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে দলটির সব নেতাকর্মীকে (প্রয়াত ও জীবিত) শ্রদ্ধা ও শুভেচ্ছা জানাই। বিশেষ করে জানাই দেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতির বটবৃক্ষসম অভিভাবক অধ্যাপক মোজাফফর আহমদকে। নীতিহীন রাজনীতির এই দেশে তিনি নীতি ও চরিত্রের প্রতীক হয়ে আরও দীর্ঘকাল বেঁচে থাকুন।

লন্ডন ।। ২৫ জুলাই।। রোববার ।। ২০১০

সংবাদটি পড়া হয়েছে ২৩ বার

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>

আমাদের সাথে যুক্ত হোন

আপনার মেইল এড্রেস লিখুন:

আজকের এক্সচেঞ্জ রেট

আজকের রেট ১ ইউরো = ১০৬.০০ টাকা

সূত্র: ন্যাশনাল একচেঞ্জ

আজকের এক্সচেঞ্জ রেট

মতামত

আমাদেরইতালী.কম সম্পর্কে আপনার মতামত কি?

Loading ... Loading ...

ক্যালেন্ডার

জুন 2010
সোমমঙ্গলবুধবৃহঃশুক্রশনিরবি
  অগা »
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031 

ফেসবুকে অনুসরণ করুন

RSS প্রথম আলো সর্বশেষ আপডেট

  • খালেদার দুর্নীতির বিচার না হলে অন্যদের করা যাবে না: হাসিনা
    প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বিরোধীদলীয় নেত্রীর আন্দোলন যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচানোর জন্য। তাঁর আন্দোলন নিজের এবং পুত্রদের দুর্নীতির বিচার বন্ধ করার জন্য। তিনি বলেন, খালেদা জিয়ার দুর্নীতির বিচার করা না গেলে অন্যদের দুর্নীতির বিচারও করা যাবে না। গতকাল রোববার গণভবনে চুয়াডাঙ্গা জেলা আওয়ামী লীগের তৃণমূলের নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। অনি […]
  • হাসিনা ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা দুর্নীতিতে জড়িত, বিচার হবে: খালেদা
    বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া বলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর পরিবার দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত। দুর্নীতির সব প্রমাণ আমাদের হাতে আছে। সময়মতো প্রমাণ দেওয়া হবে। দেশে না হলে, আন্তর্জাতিকভাবে এসব দুর্নীতির বিচার হবে।’ গতকাল রোববার ঢাকা মহানগর নাট্যমঞ্চে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটের গণ-অনশন কর্মসূচিতে প্রধান অতিথির বক্তব্যে খালেদা জিয়া এসব কথা বলেন। খালেদা […]
  • পদ না থাকলেও পদোন্নতি, প্রশাসনে সমস্যা বেড়েছে
    অপরিকল্পিত পদোন্নতিতে জনপ্রশাসনে সমস্যা বেড়েছে। গত ৮ ফেব্রুয়ারি উপসচিব থেকে অতিরিক্ত সচিব পর্যন্ত ৬৪৯ জনকে পদোন্নতি দেওয়া হয়। কিন্তু উচ্চতর পদ না থাকায় তাঁদের অধিকাংশই এখনো আগের পদেই রয়ে গেছেন। এ ছাড়া পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের আবেদন পর্যালোচনার যে উদ্যোগ সরকার নিতে চেয়েছিল, সেটাও এখন আর হচ্ছে না। সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, পদোন্নতি পাওয়া কর্মকর্তারা ‘অন্তর […]
© ২০১০ আমাদের ইতালী. সর্বস্বত্ত্ব সংরক্ষিত | RSS

ডিজাইন এবং ডেভেলপঃ idea52.com