আহসান কবির
বাংলাদেশে কোনো কোনো জিনিস এত বেশি দিন ঝুলে থাকে যে, সেটা নিয়ে বার বার নাড়াচাড়া করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। আগে এমন একটা জিনিস ছিল ক্রসফায়ার। এখন হয়েছে গুপ্তহত্যা।
প্রথমে ক্রসফায়ার নিয়ে কিছু অন্যরকম প্রসঙ্গ তুলে ধরা যাক। বাংলাদেশের সম্ভবত প্রথম এবং সবচেয়ে বেশি আলোচিত ক্রসফায়ারের ঘটনায় নিহত মানুষটার নাম সিরাজ শিকদার। এ দেশে সন্ত্রাসী লাইনের পিচ্চি হান্নান আর ডেভিডরা গ্রেফতার হলে এদের ক্রসফায়ারে নেয়া হয়। অথচ একই লাইনের পিচ্চি হেলাল কিংবা ফ্রিডম সোহেলরা ধরা পড়লে এদের ক্রসফায়ারে নেয়া হয় না। নেয়া হয় না শায়খ আব্দুর রহমান, বাংলা ভাই কিংবা সদ্য গ্রেফতারকৃত জেএমবি প্রধান মাওলানা সাইদুর রহমানদের। কেন? রাষ্ট্রপক্ষের কারা সিদ্ধান্ত নিচ্ছে ক্রসফায়ারেরÑ সেটা একটা অতীব গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার।
ক্রসফায়ার নিয়ে মানবাধিকার সংস্থাসহ বিভিন্ন মহলে বছরের পর বছর একই হৈচৈ চলতে থাকলে সরকারের কাছে আরেকটি আইডিয়া খুব দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। বর্তমানে সারাদেশে সেটা নিয়ে আলোচনা চলছে। জিনিসটার নাম গুপ্ত হত্যা। গুপ্ত হত্যা নিয়ে কমন কিছু কথা পুরনো লেখা থেকে তুলে আনা উচিত।
জেরুজালেমে হাসাসিন নামে এক সম্প্রদায় বাস করত। এরা গুপ্ত সাধনা করত। নেশা করত। প্রতিপক্ষকে খুন করত গোপনে, নিজেরাও আত্মহত্যা করত। এই হাসাসিন থেকে এসেছে এ্যাসাসিনেশন শব্দটি। আততায়ী এসে খুন করে যায়। নিজেকে গোপন রাখার চেষ্টা করে। এই হচ্ছে এ্যাসাসিনেশন। এ ধরনের হত্যাকা-ের অনেক নজির আছে। যেমন আব্রাহাম লিংকন কিংবা জন এফ কেনেডি। শাহ যখন ইরানে তার রাজত্ব চালাচ্ছিলেন তখন বিরোধী মত দমনে এমন ব্যবস্থা নিয়েছিলেন। বাসাবাড়ি থেকে তুলে নিয়ে মানুষদের গায়েব করে দেয়া হতো। হিটলারের গেস্টাপো বাহিনী বিরোধীদলীয় লোকদের তুলে নিয়ে নির্মম অত্যাচার চালাত। কখনো খুন করে ফেলত। রাষ্ট্রীয় হত্যাকা- যখন রাজনৈতিকভাবে কেউ করে তখন সেটা বিশ্বব্যাপী আলোচনার জন্ম দেয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান ও তার পরিবারের হত্যাকা-ের ঘটনা, ঘানার প্যাট্রিস লুলুম্বা চিলির আলেন্দেসহ এমন বহু হত্যাকা-ের নজির রয়েছে। অথচ সেই একই রাজনীতি দিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার নামে যখন রাষ্ট্র তুলনামূলক অনেক কম আলোচিত এবং সাধারণ মানের নাগরিককে হত্যা করে তখন সেটা তেমন আলোচিত হয় না। মানবাধিকার সংগঠনগুলো তাদের কিছু রুটিনওয়ার্ক হিসেবে এই ধরনের রাষ্ট্রীয় হত্যাকা-ে নিহত মানুষের খোঁজখবর করে। ইদানীং বিএনপিদলীয় কাউন্সিলর চৌধুরী আলমকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তার পরিবারসহ বিএনপি বলছে যে চৌধুরী আলম গুপ্ত হত্যার শিকার হয়েছেন।
২০০৭ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে গুপ্ত হত্যাকে এ দেশে একরকম প্রমোট করা হয়। প্রথম যে মানুষটা গায়েব হয়ে যেয়ে আলোচনার জন্ম দেন তার নাম লিয়াকত হোসেন। বাসা থেকে ধরে নেবার পর মানুষটা আর ফিরে আসেননি। তার স্ত্রী সাংবাদিক সম্মেলন করেছিলেন। আদালত থেকে নির্দেশও দেয়া হয়েছিল তাকে খুঁজে বের করে দেবার। কিন্তু কে দেবে? রাষ্ট্র? রাষ্ট্র যখন নিজে গুপ্ত হত্যাকে প্রমোট করে তখন? আসলে এসব গুপ্ত হত্যা নয়, স্রেফ রাষ্ট্রীয় হত্যাকা-। এই সরকারের আমলে এই সংখ্যা বাড়ছে উল্লেখযোগ্য হারে। গানে আছে কেন ভালোবাসা হারিয়ে যায় দুঃখ হারায় না! বই-এর নাম আছে ভালোবাসা নাও হারিয়ে যেও না। শুধুমাত্র বাংলা ছবিতে ছোটকালে দুই ভাই হারিয়ে গেলে শেষে মিল হয়।
রাষ্ট্র বাংলা ছবি না। হারিয়ে যাওয়া লিয়াকত কিংবা চৌধুরী আলমরা কোনো একদিন রিপ ভ্যান উইংকেলের মতো ফিরবেনÑ সেটা হয়ত কেউ আর আশা করে না। এমন গুপ্ত হত্যা গত পাঁচ বছরে সবচেয়ে বেশি হয়েছে পাকিস্তানে। কী অবস্থা পাকিস্তানের?
জানি না দেশটা হারিয়ে যাবার দিকে যাচ্ছে কিনা!
সংবাদটি পড়া হয়েছে ১১ বার



